চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড পরিমাণ ধস নেমেছে। জুলাই থেকে মার্চ সময়ে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে উন্নয়ন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা সরকারের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রোববার প্রকাশিত পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি ব্যয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ৮২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় কমেছে প্রায় ৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। একক মাস হিসেবে মার্চে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায়ও কম।
আইএমইডির পরিসংখ্যান বলছে, আগের অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তার আগের তিন অর্থবছরে প্রথম ৯ মাসে এ হার ছিল ৪১ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে। ফলে চলতি অর্থবছরের বাস্তবায়ন হার সাম্প্রতিক ধারাবাহিক প্রবণতাও ভেঙে দিয়েছে এবং ২০০৪–০৫ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।
বাস্তবায়নে ধীরগতির প্রেক্ষাপটে সরকার মূল এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়েছে। আগে এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক ব্যয়ের চিত্রে দেখা যায়, প্রথম ৯ মাসে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এরপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ৮ হাজার ৯২০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগ ৭ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ ৬ হাজার ২৬২ কোটি টাকা এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ব্যয় করেছে ২৬৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ব্যয় করেছে ৬৭৮ কোটি টাকা।
সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে কমেছে ৫৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের কাটছাঁট মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ তাদের মাসিক অর্থনৈতিক হালনাগাদে উল্লেখ করেছে, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন শুরুর বিলম্ব, তহবিল ছাড়ে জটিলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ চক্রে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে, নতুন প্রকল্প গ্রহণ কমছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান কিন্তু অগ্রগতি কম এমন প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার খুব কম, সেগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই করে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে অগ্রাধিকার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:








