আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার শর্ত পূরণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় রিজার্ভ স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক আস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে (১৩-১৮ এপ্রিল) আলোচনার পরও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, কিছু শর্ত নিয়ে অসম্মতি থাকলেও আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আরও আলোচনা হবে এবং সিদ্ধান্ত আসতে পারে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদিত এ কর্মসূচির অনেক শর্ত বর্তমান সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কর্মসূচি শেষ হতে আরও ছয়-সাত মাস লাগবে, এরপর নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও ৮০ কোটি ডলার যোগ হয়ে মোট ৫৫০ কোটি ডলার হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ডলার, যার মধ্যে ১৩০ কোটি ডলারের ষষ্ঠ কিস্তি গত ডিসেম্বরে ছাড়ের কথা ছিল।
প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানো, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ হ্রাস। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। কর-জিডিপি অনুপাত এখন সাড়ে ৭ শতাংশের কাছাকাছি, যা আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রার নিচে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আইএমএফ কর্মসূচিতে থাকা প্রয়োজন। রিজার্ভ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানোয় আমদানি বৃদ্ধিতে চাপ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সব ভর্তুকি তুলে নেওয়া ও কর অব্যাহতি বাতিলের মতো শর্ত সহসা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সরকারকে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তুলে ধরে দক্ষ আলোচনা করতে হবে।
সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম ১৫-২০ টাকা বাড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, এ সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ বাজেট ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছে, আইএমএফের শর্তপূরণের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনাধীন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান সরকার কিছু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে, যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। মাসরুর রিয়াজ বলেন, আইএমএফ এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে যে এসব উদ্যোগ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং বাজেটে অতিরিক্ত ঋণের প্রয়োজন হবে না, তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
সরকার অন্য দাতা সংস্থার কাছে প্রায় ৩১৫ কোটি ডলারের অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছে। আইএমএফের শর্তপূরণ অন্য ঋণপ্রাপ্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি পরিবর্তন ও ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে, তবে ব্যাংকিং সংস্কারে অগ্রগতি ধীর।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ আমলের উত্তরাধিকারসূত্রে রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক চাপ (মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি) সরকারের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারকে স্বচ্ছ আলোচনা ও ধাপে ধাপে সংস্কারের মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী মাসের মধ্যে আসতে পারে বলে সরকার আশা প্রকাশ করেছে।
আরও পড়ুন:








