দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস রপ্তানি খাত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টানা নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যে পড়েছে। গত আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা আট মাস পণ্য রপ্তানি কমেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। সর্বশেষ মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় ১৮ শতাংশের বেশি কমে ৩৪৮ কোটি ডলারে নেমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই পতন অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য নতুন শঙ্কা তৈরি করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, মার্চে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক মাসেই কমেছে ৭৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
তৈরি পোশাক খাতে বড় ধস
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, আর এই খাতেই পতন সবচেয়ে বেশি। প্রথম নয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। মার্চে এককভাবে এই খাতে আয় কমেছে প্রায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই উপখাতেই উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। বহু বছর ধরে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও এখন ভিয়েতনাম এগিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা, দীর্ঘ লিড টাইম এবং উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি হ্রাস
বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের মধ্যে ৯টিতেই রপ্তানি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ক—সবগুলো বড় বাজারেই নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে জার্মানিতে রপ্তানি সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ক্রয়াদেশ কমছে। অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিকল্প হিসেবে ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকছেন।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব
ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের শিল্পখাতে গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট উৎপাদন ব্যাহত করছে। অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শিপিং ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এবং বিকল্প দীর্ঘ নৌপথ ব্যবহারের কারণে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুই-ই বেড়েছে। ফলে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
অন্যান্য খাতেও নিম্নগতি
শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্যান্য রপ্তানি খাতেও মন্দা স্পষ্ট। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট খাতে মার্চ মাসে রপ্তানি আয় কমেছে। এসব খাতে সম্মিলিতভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের চ্যালেঞ্জকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে স্থবিরতা
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের কৃষিপণ্য ও পোশাক রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। তবে চলমান সংঘাতের কারণে আকাশ ও সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এ অঞ্চলে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্রুত নষ্ট হয় এমন কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
সামনে অনিশ্চয়তা
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এবং দেশের জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সংকট নিরসন না হলে রপ্তানি খাতে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
তাদের মতে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত নীতি সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন:








