শনিবার

২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩

শুরুতেই বড় চাপে সরকার: অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দ্বিমুখী সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:০৭

শেয়ার

শুরুতেই বড় চাপে সরকার: অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দ্বিমুখী সংকট
ছবি এআই বানানো

ভঙ্গুর অর্থনীতি ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের ব্যবধানে বড় চাপে পড়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। কম রাজস্ব আদায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, দুর্বল ব্যাংক ও পুঁজিবাজার—এসব অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ অনিশ্চিত হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে বহুগুণে।

অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে, যা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারও আবার ঊর্ধ্বমুখী, সরকারি এলসি রেটে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা এবং খোলা বাজারে প্রায় ১২৭ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। শিল্প খাতে ঋণের সুদ ১৩-১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ—সব মিলিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। তার মতে, রাজস্ব ঘাটতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও সংকটে পড়বে। তিনি আসন্ন বাজেটে বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাজস্ব খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হওয়ায় অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে, যা ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের জন্য নেতিবাচক সংকেত।

এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। এই চাপ সামাল দিতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং সার্বিক পণ্যমূল্যে। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতিতেও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদে সংসদের বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন জোরদার করেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এদিকে সংসদে আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সমর্থনে সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো পূর্ণাঙ্গ সংকট না হলেও তা দ্রুত সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি সহিংস হয়ে উঠলে এবং তৃতীয় পক্ষ এতে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার এবং সুদের হার—এই তিনটি সূচকের ভারসাম্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল সূচক। বর্তমানে তিন ক্ষেত্রেই অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা সামগ্রিক ভঙ্গুরতার ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়ায় প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—দুই ফ্রন্টে বড় ধরনের চাপে পড়েছে সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর নীতি, বাস্তবমুখী বাজেট এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।



banner close
banner close