দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে থাকলেও আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেট আকার নিয়েও আলোচনা চলছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট হতে পারে।
প্রস্তাবিত এ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এমন এক সময়ে আসছে, যখন চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় ছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরে অর্জিত হয়।
অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, মূল্যস্ফীতি রয়েছে প্রায় ৯ শতাংশে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং রফতানি খাতে চাপ অর্থনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ ছাড়া প্রায় সব প্রধান অর্থনৈতিক সূচকই নিম্নমুখী।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে উচ্চাভিলাষী বাজেট ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় বাজেটের চিন্তা যৌক্তিক নয়। বাস্তবায়নযোগ্য নয় এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করলে শেষে বাজেট কাটছাঁট করতে হয়, যা উন্নয়ন ব্যাহত করে এবং অর্থনীতিতে আস্থা কমায়।”
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত অর্থ সৃষ্টি করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর মতে, এখন প্রয়োজন স্থিতিশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।
এদিকে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ব্যবসায়ী ও অংশীজনরা কর ও ভ্যাটের চাপ কমানোর দাবি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, অতিরিক্ত করনীতি বিনিয়োগকে আরও নিরুৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বানও উঠেছে।
স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, “বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি হতে হবে কর্মসংস্থান ও আস্থার রূপরেখা। যারা অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, তাদের জন্য সহনশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, নতুন বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকতে পারে। বাকি অর্থ দেশি-বিদেশি ঋণ এবং অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব ঘাটতি প্রকট। প্রথম নয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। শেষ প্রান্তিকে প্রতি মাসে গড়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা আদায় না হলে লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত সময়ে বারবার অতিরিক্ত বাজেট ঘোষণা হলেও তার বড় অংশ বাস্তবায়ন হয়নি। এতে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য না আনতে পারলে উচ্চাভিলাষী বাজেট অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে আগামী বাজেট ঘিরে অর্থনীতিতে যেমন বড় লক্ষ্য নির্ধারণের আলোচনা চলছে, তেমনি বাস্তবতা ও সক্ষমতার প্রশ্নও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
আরও পড়ুন:








