সোমবার

২০ এপ্রিল, ২০২৬ ৭ বৈশাখ, ১৪৩৩

অর্থকষ্টে সরকার: রাজস্ব ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা ও বাজেট ঝুঁকি বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:২৪

শেয়ার

অর্থকষ্টে সরকার: রাজস্ব ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা ও বাজেট ঝুঁকি বাড়ছে
ছবি এআই জেনারেট

কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়া, ঋণের চাপ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের অর্থনীতি এখন স্পষ্ট চাপে। ব্যয় চলমান থাকলেও আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় সরকার ক্রমেই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় করেছে। নির্ধারিত তিন লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। বাকি সময়ে লক্ষ্য পূরণে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আসেনি।

আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক—তিনটি প্রধান খাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। আয়কর খাতে দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে মাত্র ৪৬ লাখ রিটার্ন জমা দিয়েছেন। করজালের বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষ থাকা এবং কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকার ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ এক লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রারও বেশি। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসেই প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যেই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আরও প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ চাওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পরবর্তী কিস্তি শর্ত পূরণ না হওয়ায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বৈঠকেও নতুন কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সুস্পষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে চাপ আরও বাড়ছে।

এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে সরকারকে। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করায় বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল, যা কমানোর চাপ ছিল। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এর মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নতুন বেতন কাঠামো এবং ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজেটের আকার বাড়ছে। তবে রাজস্ব আয় সমানতালে না বাড়ায় বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ ছিল প্রায় এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা আগামীতে আরও বাড়তে পারে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি সামগ্রিক ব্যয়চাপকে তীব্র করছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া ঝুঁকি আরও বাড়বে। তারা করব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কর ফাঁকি রোধ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঋণ ফাঁদ এড়াতে হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে।’

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, শুধু ঋণ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে কোথায় চাপ তৈরি হচ্ছে, তার সঠিক মূল্যায়ন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সার্বিকভাবে, আয়-ব্যয়ের এই ভারসাম্যহীনতা ও ঋণনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কার্যকর নীতি ও সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



banner close
banner close