বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত দেশজ বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা নামিয়ে এনেছে ৩৩টিতে, সেখানে বাংলাদেশে এ সংখ্যা ৫২। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাংকই দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত দুই দশকে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভারত ব্যাংকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। সরকারি ব্যাংক ২৭ থেকে কমে হয়েছে ১২টি, আর বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে ২১টি। এর ফলে সুশাসন ও দক্ষতা বেড়েছে, খেলাপি ঋণের হার নেমে এসেছে প্রায় ২ শতাংশে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে ৯টি সরকারি ও ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংক মিলিয়ে মোট ৫২টি দেশজ বাণিজ্যিক ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি, যা সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩৫ শতাংশ ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ হার আরও উদ্বেগজনক—কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৪০-৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সহায়তা ও অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। পেশাদারিত্বের অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব ব্যাংক কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়নি। তার মতে, এখনই সংস্কার না করলে খাতটি আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ভারতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় ভারতের ব্যাংক খাতও একই ধরনের সমস্যায় ছিল। তবে ধারাবাহিক সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একীভূতকরণের মাধ্যমে তারা খাতটিকে শক্তিশালী করতে পেরেছে। বাংলাদেশেও একই পথ অনুসরণের সুযোগ এখনো রয়েছে।
ব্যাংকার ফারুক মঈনউদ্দীন মনে করেন, অতিরিক্ত ব্যাংকের কারণে ছোট বাজারে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এতে টিকে থাকতে গিয়ে অনেক ব্যাংক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে। তার মতে, ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন অনুযায়ী দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার সুযোগ রয়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষ থেকেই আসতে হবে।’
এরই মধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল, যদিও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সংখ্যা কমানো নয়, বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, ফরেনসিক অডিট এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন বা বেসরকারিকরণের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দেশের ব্যাংক খাত এখন একটি সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়—এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের।
আরও পড়ুন:








