বৃহস্পতিবার

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

দেড় মাসে ৭৮ হাজার কোটি ঋণ: বেসরকারি খাতে সংকট, বাড়ছে বেকারের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:১৭

শেয়ার

দেড় মাসে ৭৮ হাজার কোটি ঋণ: বেসরকারি খাতে সংকট, বাড়ছে বেকারের শঙ্কা
ছবি এআই জেনারেট

মাত্র দেড় মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ সংকট তীব্র হওয়ায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, সেখানে মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায়। পরবর্তীতে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই ঋণের মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এবং ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বড় অংশ এসেছে ট্রেজারি বন্ড থেকে, যার পরিমাণ ৫৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। এছাড়া স্পেশাল ট্রেজারি বন্ড থেকে ১২ হাজার ৭৩১ কোটি এবং ট্রেজারি বিল থেকে এসেছে ৪ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট রয়েছে। খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর নীতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণ পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকায় বিনিয়োগে সক্ষমতা কমেছে। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারকে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ ফাঁদে পড়া এড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং খেলাপি ঋণের চাপের কারণে এই খাতে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

এর প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মোট বেকারের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৭ লাখ ৩০ হাজার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৪ লাখ। অর্থাৎ এক বছরে বেকার বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জুন পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়।

বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার (প্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা)। এছাড়া সঞ্চয়পত্রে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি এবং দেশীয় উৎস (ব্যাংকসহ) থেকে নেওয়া ঋণ প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা।

এই বিপুল ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।



banner close
banner close