দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক নানা ঘটনা আর্থিক খাতে আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংকের একীভূতকরণ, ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬ প্রণয়ন এবং পুঁজিবাজারে কিছু শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি—এই তিনটি প্রবণতা সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত ঋণ বিতরণের ফলে ব্যাংক খাতে সঞ্চিত ঝুঁকি সাম্প্রতিক সময়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকার পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন কাঠামো গঠন করে এবং প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সহায়তা দেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম সচল রাখা। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসব ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনের ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ব্যাংক রেজুলিউশন আইন ২০২৬-এর সাম্প্রতিক সংশোধনে শেয়ারধারীদের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, অতীতে ব্যর্থ পরিচালনাকারীরা পুনরায় ফিরে এলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই বিধান ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যদি তা কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা চলছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে পরিবর্তন আনার পর ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসায়, এখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ব্যাংক খাতের এই অস্থিরতার মধ্যে আমানতকারীদের উদ্বেগও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অতীতে কিছু ক্ষেত্রে আমানত উত্তোলনে জটিলতার কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে, যা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে পুঁজিবাজারে বাংলাদেশ অটোকারস লিমিটেডের শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী আয় ও লভ্যাংশের সঙ্গে এই মূল্যবৃদ্ধির সামঞ্জস্য নেই।
স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও তারা কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত শেয়ার সংখ্যা ও সম্ভাব্য কৃত্রিম চাহিদা এই উত্থানের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা এবং পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন জরুরি। অন্যথায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমানতের সুরক্ষায় কার্যকর আইনি গ্যারান্টি, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা এবং পুঁজিবাজারে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন:








