রবিবার

১২ এপ্রিল, ২০২৬ ২৯ চৈত্র, ১৪৩২

বড় বাজেট, বাড়তি ঋণ: সংকট ও প্রতিশ্রুতির দ্বৈত চাপে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০৯

শেয়ার

বড় বাজেট, বাড়তি ঋণ: সংকট ও প্রতিশ্রুতির দ্বৈত চাপে সরকার
ছবি এআই জেনারেট

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন সামনে রেখে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের একটি বড় বাজেট প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। তবে রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ায় বাজেট ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার বড় পরিসরে বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ঘাটতির চাপ বাড়ছে

রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। পরিমাণগতভাবে এই ঘাটতি পৌনে তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।

বিশেষ করে ভ্যাটের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবতা বলছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়বে।

ঋণনির্ভরতা বাড়ার ইঙ্গিত

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরে বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আইএমএফের কাছ থেকে স্থগিত কিস্তি ছাড় এবং অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার উদ্যোগও চলছে।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাড়তি ব্যয়

সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রথম বছরেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, খাল পুনঃখনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়নের পথে।

এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে।

ভর্তুকি ও সুদের বোঝা

সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই এখন ঋণের সুদ ও ভর্তুকিতে ব্যয় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা আগামীতে আরও বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উন্নয়ন ব্যয়ে বৃদ্ধি

আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা করা হতে পারে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প বাছাই এবং অকার্যকর প্রকল্প বাতিলের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কঠিন সমীকরণের বাজেট

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি হবে এক ধরনের সংকটকালীন বাজেট। একদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে সরকারকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, করের আওতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ছাড়া বড় বাজেটের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে ব্যয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।



banner close
banner close