রবিবার

১২ এপ্রিল, ২০২৬ ২৯ চৈত্র, ১৪৩২

আগের মালিকদের জন্য উন্মুক্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, নতুন আইনে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৩২

শেয়ার

আগের মালিকদের জন্য উন্মুক্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, নতুন আইনে বিতর্ক
ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ায় একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার পথ খুলে গেছে আগের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য। ফলে পূর্বে বিধিনিষেধের আওতায় থাকা গোষ্ঠীগুলোর জন্যও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

নতুন আইনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জারি করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো তফসিলি ব্যাংক রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় গেলে আগের শেয়ারধারক কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে এজন্য তাদের বিস্তারিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে—যেখানে সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তা ফেরত, নতুন মূলধন জোগান, বিদ্যমান ঘাটতি পূরণ, আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় পরিশোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে।

আইন অনুযায়ী, আবেদন অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নেবে। অনুমোদনের পর আগের মালিকদের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে প্রথমে সরকারের বিনিয়োগকৃত অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ জমা দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

এছাড়া পুনর্গঠিত ব্যাংকের কার্যক্রম দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে থাকবে। নির্ধারিত সময় শেষে একটি বিশেষ কমিটি শর্ত পূরণের বিষয়টি মূল্যায়ন করবে। কোনো ব্যত্যয় ধরা পড়লে অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করা হতে পারে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা এই বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, পূর্ণ শর্ত বাস্তবায়নের আগেই শুধুমাত্র অঙ্গীকারের ভিত্তিতে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে আমানতকারীদের অর্থ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং দায়ী ব্যক্তিরা সহজেই দায় এড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই আইনকে সমালোচনা করে বলেন, এটি কার্যত ব্যাংক খাতের দুরবস্থার জন্য দায়ীদের পুরস্কৃত করার শামিল। তার মতে, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেসব গোষ্ঠী ব্যাংকগুলোকে সংকটে ফেলেছে, তাদেরই আবার নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ দেওয়া জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেয়। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে; মালিকরা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।

জাতীয় সংসদে বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, এই আইনের ফলে আমানতকারীদের সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তিনি দাবি করেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে, যা সাধারণ জনগণের করের অর্থ। নতুন আইন সেই সুরক্ষা কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি জানান, ইতোমধ্যে সরকার প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং আরও বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, যা এককভাবে রাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা কঠিন। তাই বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখাই এই আইনের উদ্দেশ্য।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের আওতায় এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এর মধ্যে সরকারের বিনিয়োগ ছিল উল্লেখযোগ্য, পাশাপাশি আমানতকারীদের সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইন ব্যাংক খাতে স্বল্পমেয়াদে কিছু সমাধান আনতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির ওপর।



banner close
banner close