শুক্রবার

১০ এপ্রিল, ২০২৬ ২৭ চৈত্র, ১৪৩২

ইউরোপে পোশাক রফতানিতে ধাক্কা, কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:১৭

শেয়ার

ইউরোপে পোশাক রফতানিতে ধাক্কা, কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রফতানিতে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ সময়ে এ অঞ্চলে রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। দেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই এই অঞ্চলে হওয়ায় এ পতনকে খাতটির জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং খুচরা বিক্রির ধীরগতির কারণে পোশাকের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা মজুত কমিয়ে নতুন করে ক্রয় পরিকল্পনা করায় অর্ডারের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধীরগতির মধ্যেও সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ক্রেতারা টেকসই উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কারখানা এবং উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি আবারও গতি পেতে পারে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মোট তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ২৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি বড় কোনো সংকট নয়; বরং বৈশ্বিক ভোক্তা আচরণ ও বাজার কাঠামোর পরিবর্তনের প্রতিফলন।

যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। অন্যান্য বাজারের তুলনায় এ পতন কম হওয়ায় একে তুলনামূলক স্থিতিশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে মৃদু পতন

যুক্তরাজ্যে জুলাই–মার্চ সময়ে রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬১ শতাংশ কম। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ইউরোপীয় বাজারের সামগ্রিক ধীরগতির প্রভাব এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

কানাডায় প্রায় স্থিতিশীল বাজার

কানাডায় রফতানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ২৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজারে স্থিতিশীলতা ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

অপ্রচলিত বাজারে বড় সংকোচন

সবচেয়ে বড় চাপ দেখা গেছে নতুন বা অপ্রচলিত বাজারগুলোতে, যেখানে রফতানি কমেছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। উদ্যোক্তারা বলছেন, এসব বাজারে টিকে থাকতে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন কৌশল ও শক্তিশালী ক্রেতা সম্পর্ক জরুরি।

পণ্যের ধরনেও পরিবর্তন

পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিটওয়্যার রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক কমেছে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এতে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও সাবেক বিজিএমইএ পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “এই পরিস্থিতিকে সরাসরি সংকট হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক বাজারের পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা উচিত।” তার মতে, ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার, উচ্চমূল্য সংযোজন এবং প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববাজারে ভিয়েতনাম, ভারত ও তুরস্কের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের জন্য উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের এই পরিবর্তনকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।



banner close
banner close