বৃহস্পতিবার

৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২৬ চৈত্র, ১৪৩২

বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল, সরবরাহে ঝুঁকির শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩১

আপডেট: ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৩২

শেয়ার

বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল, সরবরাহে ঝুঁকির শঙ্কা
ছবি সংগৃহীত

দেশের বিদ্যুৎ খাতে সরকারি-বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া বিল ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কোম্পানিভেদে ছয় থেকে ১৪ মাস পর্যন্ত বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ তীব্র আকার ধারণ করেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিল পরিশোধে অনিয়ম এবং ভর্তুকির ঘাটতির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি আমদানি ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, মার্চ মাসের বিল যুক্ত হলে বকেয়ার পরিমাণ আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে মার্চের বিল জমা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা যোগ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল পরিমাণ এ বকেয়া আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদনে ঘাটতি ও লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বেসরকারি উদ্যোক্তারা জানান, বিল পরিশোধের ধীরগতির কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। এতে জ্বালানি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বেসরকারি খাতের তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যেমন, একটি শীর্ষ কোম্পানির কাছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ইউনাইটেড গ্রুপের কাছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির ঝুঁকি বাড়ছে এবং জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) নেতারা জানিয়েছেন, বকেয়ার বড় অংশ দ্রুত পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের মতে, বর্তমানে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি মজুদ সীমিত, যা দিয়ে দীর্ঘ সময় উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়।

চলতি গ্রীষ্মে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট ব্যাংক খাতেও প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ঋণ পরিশোধে সমস্যা তৈরি হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর কিস্তি আদায়কে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, ভর্তুকির অর্থের ওপর নির্ভর করেই বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে এবং বিষয়টি সমাধানে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আদালতে চলমান কিছু মামলার কারণে অর্থ পরিশোধে জটিলতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বকেয়া বিল পরিশোধে দ্রুত ও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ না নিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যাংক খাত—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।



banner close
banner close