রবিবার

৫ এপ্রিল, ২০২৬ ২২ চৈত্র, ১৪৩২

সৌরবিদ্যুতে এগিয়ে পাকিস্তান, পিছিয়ে বাংলাদেশ: বাড়ছে জ্বালানি ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৫৮

আপডেট: ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩:০০

শেয়ার

সৌরবিদ্যুতে এগিয়ে পাকিস্তান, পিছিয়ে বাংলাদেশ: বাড়ছে জ্বালানি ঝুঁকি
ছবি সংগৃহীত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে পাকিস্তান দ্রুত সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকে আমদানি ব্যয় কমাতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ একই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে দেশে জ্বালানি নির্ভরতা ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়ে পাকিস্তান। গ্যাস ঘাটতি ও তাপপ্রবাহে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মুখে দেশটি বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেয়। বৈশ্বিক বাজারে সৌর প্যানেলের দাম কমে যাওয়া এবং সরকারি প্রণোদনার ফলে দ্রুত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমপরিমাণ সৌর সক্ষমতা গড়ে তোলে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমে এবং গ্যাস ও এলএনজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এড়াতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

বর্তমানে পাকিস্তানে এলএনজির ব্যবহার মোট বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং তা মূলত রাতের সময় সীমাবদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রণোদনার কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাত দেশটির জন্য বড় সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অংশ ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনো গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপরই প্রধান নির্ভরতা রয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দিনের বড় অংশের বিদ্যুৎ চাহিদা সৌরশক্তি থেকে পূরণ করা সম্ভব ছিল। এতে ব্যয়বহুল এলএনজি ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো যেত।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ালেও বাংলাদেশে সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি।

তিনি জানান, শিল্প খাতে ইতোমধ্যে ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আরও ৪০০-৬০০ মেগাওয়াট প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে। শুল্ক ও নীতিগত সহায়তা বাড়ানো গেলে এ খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।

বাংলাদেশ প্রতি বছর ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি জ্বালানি আমদানি করে। এর বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন মাত্র ৮০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ সর্বোচ্চ প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারে, যা মোট চাহিদার সাড়ে ৪ শতাংশেরও কম।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের মতে, শিল্পকারখানার ছাদ ও জলাশয়ে সৌর অবকাঠামো গড়ে তুললে ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সম্প্রতি সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ কমিয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন প্রকল্পগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আগের তুলনায় ৬-৭ টাকা কম নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে নীতিগত অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে অনাগ্রহ এবং দক্ষ জনবলের অভাব এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট কমানো, স্থিতিশীল নীতি ও কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।



banner close
banner close