মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বহুমাত্রিক চাপে দেশের অর্থনীতি যখন অনিশ্চয়তার মুখে, তখনই আসছে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার, যা হবে বর্তমান বাস্তবতায় বড় এক পরীক্ষা।
আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—এসবই এবারের বাজেটের মূল অগ্রাধিকার।
বাজেটের সম্ভাব্য কাঠামো
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজেটের আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ।
এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে একাই ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজস্ব আদায়ে বড় চ্যালেঞ্জ
রাজস্ব আদায় এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘাটতি ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি। বছর শেষে এই ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করের আওতা বৃদ্ধি, এনবিআরের আধুনিকায়ন ও প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায়ে গতি আনা সম্ভব নয়। অন্যথায় বড় বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ের ওপর। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়তে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় ৪-৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করবে।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার চাপ
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ জরুরি। তবে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে বিনিয়োগ কমে গেছে। এতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও বাস্তবতা
আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ শতাংশ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা অর্জন কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। টেকসইভাবে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বেতন-ভাতা ও ব্যয়ের চাপ
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কারণে বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এতে সামগ্রিক বাজেট ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, সরকার ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে যেতে চায় এবং স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে টাকা ছাপানোর পথে হাঁটবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় সংযত রাখা এবং কার্যকর সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার মধ্যে প্রণীত হতে যাওয়া এবারের বাজেট হবে একদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষাও।
আরও পড়ুন:








