বুধবার

২০ মে, ২০২৬ ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

এক বছরে রফতানি আয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের পতন, বাড়লেও রেমিট্যান্সে ঘাটতি পূরণ হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:৩৮

শেয়ার

এক বছরে রফতানি আয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের পতন, বাড়লেও রেমিট্যান্সে ঘাটতি পূরণ হয়নি
ছবি সংগৃহীত

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই খাত-রফতানি ও প্রবাসী আয়-গত এক বছরে ভিন্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও রফতানি আয়ের বড় পতনের কারণে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমেছে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রফতানি আয়ই কমেছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে রফতানি ও রেমিট্যান্স মিলিয়ে দেশে এসেছিল প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রফতানি আয় ছিল প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স ৩০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই আয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারে। এ সময়ে রফতানি আয় কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এলেও রেমিট্যান্স বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্সে রেকর্ড, তবু স্বস্তি সীমিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা এক মাসে সর্বোচ্চ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় এবং ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানোর ফলে এই ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স বাড়লেও রফতানি আয়ের বড় ঘাটতি পূরণে তা যথেষ্ট নয়।

টানা নিম্নমুখী রফতানি

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে দেশের রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৮ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ পতন হয়েছে। টানা আট মাস ধরে এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) রফতানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।

পোশাক খাতে চাপ স্পষ্ট

দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে এই খাতেও ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালের মার্চে পোশাক রফতানি আয় ছিল ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে।

নিটওয়্যার ও ওভেন-উভয় খাতেই পতন হয়েছে; নিটওয়্যার কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ এবং ওভেন প্রায় ১৭ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন অর্ডার কমে গেছে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও চাহিদা সংকট

রফতানিকারকদের মতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। কম দামে পণ্য সরবরাহের কারণে এসব দেশ বাজারে এগিয়ে যাচ্ছে, ফলে বাংলাদেশের রফতানি চাপে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে উন্নত দেশগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়াও বড় কারণ।

জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। এতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় শিল্পকারখানায় উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

নীতিগত সহায়তার তাগিদ

বর্তমান পরিস্থিতিতে রফতানিকারকরা শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজার খোঁজার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি বাজার বৈচিত্র্য করা, পণ্যে নতুনত্ব আনা এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ সম্ভব নয়।

সামনের চ্যালেঞ্জ

রেমিট্যান্স বাড়লেও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আমদানি ব্যয় মেটাতে বড় অঙ্কের ডলার প্রয়োজন হওয়ায় এই চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রফতানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।



banner close
banner close