বুধবার

২৫ মার্চ, ২০২৬ ১১ চৈত্র, ১৪৩২

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ মার্চ, ২০২৬ ১৭:৩৩

আপডেট: ২৫ মার্চ, ২০২৬ ১৭:৩৪

শেয়ার

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার
ছবি সংগৃহীত

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসেই বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে প্রায় দেড় বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ঋণ বৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনা, ডলার সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সরকারি খাতেই ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে। সরকারি খাতে সেপ্টেম্বরের ৯২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ঋণ বেড়ে ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে একই সময়ে ঋণ ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে মোট ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে সরকারি খাত থেকে।

ঋণ বাড়ার কারণ

গত এক দশকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল ও বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ নানা প্রকল্পে এ ঋণ ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বাজেট ঘাটতি পূরণ, সরকারি ব্যয় নির্বাহ এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ নেওয়া হয়েছে।

ডলার সংকটের প্রভাব

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ–পরবর্তী বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন চাপে পড়ে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের চাহিদা বাড়ায় টাকার বিপরীতে ডলারের দর ৮৫ থেকে প্রায় ১২২ টাকায় উঠে যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক সহায়তা বাড়ায় পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।

ঝুঁকি নাকি সুযোগ

জাহিদ হোসেন–এর মতে, বৈদেশিক ঋণ নিজে সমস্যা নয়, যদি তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণ এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শোধের চাপ নিয়ে শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ঋণের পরিমাণের চেয়ে সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপই বড় উদ্বেগের বিষয়। ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ শুরু হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে যদি রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন হলেও ঋণ ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তারা ঋণের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং নতুন ঋণ গ্রহণে সতর্কতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে সংকটজনক না হলেও এর সঠিক ব্যবস্থাপনাই নির্ধারণ করবে—এটি ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বোঝা হবে, নাকি উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।



banner close
banner close