বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পর এবার কয়লার দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ান কোল ইনডেক্সের তথ্যানুযায়ী, টনপ্রতি কয়লার দাম গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে ছিল ৬৭ ডলার। পাশাপাশি জাহাজের ফ্রেইট সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ এবং প্রিমিয়াম চার্জও বেড়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির ওপর দেশের বিদ্যুৎ খাতের নির্ভরতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে, যার অধিকাংশই আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি গড় খরচ সাড়ে ১১ টাকা। ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ৫ হাজার কিলোক্যালরি মানের কয়লার টনপ্রতি দাম বেড়ে ৭২ ডলার হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬৭ ডলার। জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে দেশে পৌঁছাতে টনপ্রতি খরচ ৯০ থেকে ৯৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল প্রাইস ইনডেক্সেও কয়লার দাম বেড়েছে টনপ্রতি ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে টনপ্রতি ১০৯ ডলার থাকলেও তা বেড়ে ১৩১ ডলার ৭৫ সেন্টে পৌঁছেছে, অর্থাৎ দেড় মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২২ ডলার।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশের সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট ১১ লাখ ৬৫ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৫ লাখ ৩৪ হাজার টন, রামপালে ২ লাখ ৬৫ হাজার টন এবং মাতারবাড়ীতে ৮৭ হাজার ৯১৭ টন কয়লা মজুদ রয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য স্থানীয় খনি থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার টন কয়লা মজুদ আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে কয়লার দামও বাড়া স্বাভাবিক। এলএনজির দাম বৃদ্ধির কারণে বহু দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ফলে চাহিদা বেড়ে কয়লার দাম বাড়ছে, যা বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ বাড়াবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, কয়লার দাম খুব বেশি না বাড়লেও জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম অনেক বেড়েছে। ঈদের পরে বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি জানান, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুম বিবেচনায় আগেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে মজুদ বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে আরও দুই-একটি কেন্দ্রে মজুদ বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভালো অবস্থানে থাকা যেত।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গুস মিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, মার্চে বাংলাদেশে কয়লা আমদানি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ১৫ লাখ টনে পৌঁছতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও কিছু কয়লা আমদানি করা হচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে। পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে কয়লার দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন:








