বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে চলতি বছরে অর্থনৈতিক লেনদেনের পরিমাণ তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। রমজানের শেষ সপ্তাহ থেকে ঈদের আগমুহূর্ত পর্যন্ত সারা দেশে বাড়তি কেনাকাটা ও ভোগব্যয়ের ফলে এই অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার দুই থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার মধ্যে থাকলেও এবার তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। ভোগনির্ভর অর্থনীতিতে এই প্রবৃদ্ধি বাজারে লেনদেন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনের তথ্যমতে, রমজান মাস থেকে ঈদ পর্যন্ত নতুন পোশাক, যাকাত, ফিতরা, উপহার এবং অন্যান্য খাতে ব্যয়ের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার অর্থের সঞ্চালন ঘটছে। তার ভাষ্যমতে, লেনদেন বৃদ্ধি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটিয়ে ওঠায় ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে এবং কেনাকাটার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ঈদবাজারে লেনদেনের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদকেন্দ্রিক ভোগব্যয় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের তথ্যমতে, ঈদের অর্থনীতির নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ কঠিন হলেও এটি বাজারে বড় ধরনের চাহিদা সৃষ্টি করে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের বোনাস এবং তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের অতিরিক্ত আয় দ্রুত ভোগব্যয়ে রূপ নেয়, যা অর্থপ্রবাহ বাড়ায়।
তার তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে প্রবাসী আয়ের প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রবাসীরা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমানের তথ্যমতে, ঈদ দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এ সময় বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ে, যা স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় গতি আনে। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদবাজারে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে পোশাক খাত। মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নতুন পোশাক ও ফ্যাশন পণ্যে ব্যয় হয়। এই সময়ে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, শার্ট, জিন্স ও শিশুদের পোশাকের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শুধু পোশাক খাতেই প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পোশাকের পাশাপাশি জুতা, ব্যাগ, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। অনেক পরিবার ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশন, ফ্রিজ এবং আসবাবপত্র কেনে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট খাতেও বিক্রি বাড়ে।
রমজান মাসে ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে খাদ্যখাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। পাশাপাশি যাকাত ও ফিতরার অর্থ নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বণ্টিত হওয়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় বাজারে লেনদেন বাড়ে।
ঈদকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। শহর থেকে গ্রামে যাতায়াত বৃদ্ধির কারণে বাস, ট্রেন ও নৌপথে যাত্রীসংখ্যা বেড়ে যায়, ফলে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত আয় হয়। একইসঙ্গে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতেও চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চের প্রথমার্ধে প্রবাসীরা দেশে ২২০ কোটির বেশি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার সমান। এই অর্থের একটি বড় অংশ ঈদকেন্দ্রিক ব্যয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সার্বিকভাবে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে একটি মৌসুমি গতি তৈরি হয়। উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন ও খুচরা বিক্রিসহ বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোগব্যয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
আরও পড়ুন:








