আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ২৩ মার্চ ঢাকা সফর করবে। সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই প্রতিনিধি দল দুই দিনের সফরে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে। আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি হিসেবে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার আগামী জুন মাসে ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই অর্থ ছাড়ের আগে বিনিময় হার বাজারভিত্তিককরণ, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও ব্যাংক খাতের সংস্কারসহ কয়েকটি শর্ত পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
প্রতিনিধি দলটি ঢাকা সফরকালে প্রধান উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। এসব বৈঠকে ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি, সংস্কার বাস্তবায়নের গতি ও সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার বিষয়ে আলোচনা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইএমএফ মূলত নতুন সরকারের কাছ থেকে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে চাইবে। আগামী এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভার পার্শ্ব বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য মোট ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে আইএমএফ। সাত কিস্তিতে এই অর্থ ছাড়ের কথা রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের জুন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ প্রায় ৩৬৫ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে পঞ্চম পর্যালোচনার পর গত নভেম্বর থেকে নতুন কিস্তি ছাড় স্থগিত রয়েছে। আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, রাজস্ব আহরণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে এবং ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের কৌশল চূড়ান্ত হয়নি। অন্যদিকে প্রাথমিক বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য অর্জন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে কিছু উন্নতি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করলেও কিছু বিষয়ে এখনও অগ্রগতি প্রয়োজন। সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার রয়েছে, তাই আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে।
দক্ষিণ এশীয় নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেছেন, আইএমএফ কর্মসূচি সফলভাবে শেষ করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, আইএমএফের মূল্যায়ন দুর্বল হলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও অর্থায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে যায়, যা বহুপাক্ষিক ঋণ ও বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার এবং বাংলাদেশ চাইলে একই কর্মসূচির আওতায় আরও সময় বা অতিরিক্ত অর্থ সহায়তার বিষয়েও আলোচনা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের হারে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের নিম্নতম দেশগুলোর একটি। রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাস, করমুক্তির সুযোগ সীমিত করা এবং ন্যূনতম টার্নওভার কর বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়লে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে বলে তারা মনে করেন।
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা সফল হলে জুন মাসে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের পথ খুলে যেতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন:








