জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ব্যয় বিবেচনায় আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে সরকারের ঋণ গ্রহণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের কথা রয়েছে। রাজস্ব আহরণের তুলনায় সরকারি ব্যয় বেশি হওয়ায় পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশও ঋণের মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে।
সরকারের বছরভিত্তিক ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি, ২০২৭–২৮ অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং ২০২৮–২৯ অর্থবছরে দেড় লাখ কোটির বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর সঙ্গে ঋণের সুদও পরিশোধ করতে হবে। সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকার ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১১ ডলারে কেনা হয়েছিল, বর্তমানে স্পট মার্কেটে তা ২৪ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া ও গানভরের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয় করেছে বাংলাদেশ। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে এ খাতে সরকারের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ অর্থ বিভাগের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে।
সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রদান, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ এবং ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও সরকারের সামনে একটি বড় আর্থিক দায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপও ধীরে ধীরে বাড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণের কিস্তি ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া উত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেল, দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ, কর্ণফুলী টানেল এবং পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ও সুদও নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান তথ্য দেন যে জ্বালানির উচ্চমূল্য, সম্ভাব্য পে-স্কেল বাস্তবায়নের ব্যয়, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ এবং সুদের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের রাজস্ব ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হওয়ায় বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কারিগরি সহায়তায় আগামী অর্থবছর থেকে বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এ পরিকল্পনায় বছরের কোন সময়ে কোন উৎস থেকে কত ঋণ নেয়া হবে তা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও পূর্ব পরিকল্পনা জোরদার করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। এতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে।
আরও পড়ুন:








