সোমবার

১৬ মার্চ, ২০২৬ ২ চৈত্র, ১৪৩২

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য তদন্তে নজরদারিতে বাংলাদেশ, রফতানি খাতে সম্ভাব্য প্রভাবের আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ মার্চ, ২০২৬ ০৮:২৪

শেয়ার

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য তদন্তে নজরদারিতে বাংলাদেশ, রফতানি খাতে সম্ভাব্য প্রভাবের আশঙ্কা
প্রতিকী ছবি

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, শ্রমমান ও শিল্প সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে কি না এবং উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে একাধিক তদন্ত শুরু করেছে দেশটি। এ পদক্ষেপের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তার আলোচনা শুরু হয়েছে এবং বাংলাদেশের রফতানি খাতেও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর জানায়, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী তদন্ত পরিচালিত হবে। এতে বিভিন্ন দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট নীতি বা অনুশীলন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে কি না তা যাচাই করা হবে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার তথ্য দেন যে আন্তর্জাতিকভাবে জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে ঐকমত্য থাকলেও অনেক দেশ এখনও এমন পণ্য তাদের বাজারে প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। তার মতে, এই পরিস্থিতি মার্কিন শ্রমিক ও ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

তদন্তের আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না তা মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিরুদ্ধেও পৃথক তদন্ত শুরু হয়েছে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। তবে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের নীতি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর মনে করে, তাহলে সেকশন ৩০১-এর অধীনে শুল্ক বৃদ্ধি, আমদানি সীমাবদ্ধতা বা অন্যান্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য নতুন শুল্ক বা বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলে তা দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি বিদেশি পণ্যের ওপর জরুরি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়ে আরোপ করা কিছু শুল্ক বাতিল হওয়ার পর বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে বাণিজ্য নীতি কার্যকর করার পথ খুঁজছে। বর্তমানে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় বিশ্বব্যাপী আমদানির ওপর ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার মেয়াদ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের ধারণা, সেকশন ৩০১-এর আওতায় তদন্তের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট দেশ বা খাতভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং এ ধরনের শুল্কের হার ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান তথ্য দেন যে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের তদন্ত পরিচালনা করে থাকে এবং এটি তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্য নজরদারির অংশ। তিনি উল্লেখ করেন যে বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও সরবরাহের পরিবর্তনের কারণে উৎপাদন কখনও বেশি বা কম হতে পারে, যা বাণিজ্যের স্বাভাবিক চক্রের অংশ।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের রফতানি সাফল্য মূলত শ্রমঘন উৎপাদন, বেসরকারি উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে সক্রিয় অংশগ্রহণের ফল। ভারী শিল্পে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি বা পরিকল্পনার ওপর এই সাফল্য নির্ভরশীল নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান তথ্য দেন যে যুক্তরাষ্ট্র শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা এবং নিজস্ব শ্রমবাজার সুরক্ষার কৌশলের অংশ হিসেবে বাণিজ্য নীতি আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে। তার মতে, বাংলাদেশের মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশের রফতানি কাঠামোর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন যে বৈশ্বিক বাণিজ্যে এখন ভূরাজনীতি, শিল্পনীতি এবং সামাজিক মানদণ্ডের প্রভাব বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি শ্রমমান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান তথ্য দেন যে তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকা অস্বস্তিকর হলেও এতে তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি তিনি দেখছেন না। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেই এ ধরনের তদন্ত পরিচালিত হয়ে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমমান ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা জোরদার করা, রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনায় সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।



banner close
banner close