মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। এ পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ১৭ মার্চ থেকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জ্বালানি সংকট ও দীর্ঘ ছুটির কারণে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
সরকার ঘোষিত ছুটি অনুযায়ী ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি থাকবে। এরপর ২৪ ও ২৫ মার্চ অফিস খোলা থাকলেও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এ দুই দিনের জন্য অতিরিক্ত ছুটি নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ২৭ ও ২৮ মার্চ সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কার্যত ১৭ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১২ দিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছুটির পরিবেশ থাকতে পারে।
এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পণ্য পরিবহন কার্যক্রম ইতোমধ্যে চাপের মুখে পড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কোনো বাজারে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৩৫০ টাকার বেশি এবং ব্রয়লার মুরগি ২৫০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। ডিম ও সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী।
দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে বড় শহর থেকে গ্রামে মানুষের যাতায়াত বাড়ায় দূরবর্তী এলাকায় পণ্য পরিবহনের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য পরিবহন ব্যয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ছুটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, টানা ছুটির কারণে উৎপাদন, অফিস কার্যক্রম ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা কয়েক দিনের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, দীর্ঘ ছুটি আমদানি ও রফতানি কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। বন্দরে জাহাজ দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয় এবং সেই ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থায়ও। দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ জানিয়েছে, পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় তাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ট্রাক চালানো যাচ্ছে না। ফলে কাঁচামাল পরিবহন এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে।
মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যানবাহন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাজারে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।
একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছে টিকে গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ডিরেক্টর মোহাম্মদ মোফাসসেল হক জানান, জ্বালানি সংকট সরাসরি তাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। পণ্য পরিবহন ও বিতরণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় ডেলিভারি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং যানবাহনের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না।
ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বনস্পতি বাণিজ্য সচিবের কাছে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের নিজস্ব পরিবহনের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার করা যাচ্ছে না এবং ভাড়ার যানবাহন সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২২ সালের শুরু থেকেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এটি দুই অংকের ঘরে অবস্থান করে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা কমলেও পরবর্তী সময়ে আবারও বাড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাবেই এ চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ ছুটির সময় কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দেয়। বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় চালকল বন্ধ থাকা ও ধান কেনাবেচা স্থবির হয়ে পড়ায় বাজারে চালের দাম বেড়েছিল। গবেষণায় দীর্ঘ ছুটিকে এ মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রভাবক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:








