বুধবার

১১ মার্চ, ২০২৬ ২৭ ফাল্গুন, ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে সংকটে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ মার্চ, ২০২৬ ০৮:০৬

শেয়ার

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে সংকটে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা
ছবি সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে নতুন সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত। আকাশপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জরুরি চালান বিমানবন্দরে আটকে পড়ছে। পাশাপাশি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সমুদ্রপথেও পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি এই পোশাক খাত ইতোমধ্যে টানা কয়েক মাস ধরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ব পোশাক উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানাগুলো থেকে ইউরোপের বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ডে নিয়মিত পোশাক সরবরাহ করা হয়। এসব পণ্যের একটি অংশ দ্রুত সরবরাহের জন্য আকাশপথে পাঠানো হয়। তবে সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ আকাশসীমা সীমিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতির কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোতেও কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কয়েক দিন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যত বন্ধ রাখতে হয়। একই সঙ্গে কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদসহ প্রধান কয়েকটি বিমান সংস্থা বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফলে ওই রুটে নির্ভরশীল পণ্য পরিবহনে বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে পণ্য পরিবহনে উপসাগরীয় এয়ারলাইনগুলোর ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক ফ্লাইটের কার্গো হোল্ডের পাশাপাশি বিশেষায়িত মালবাহী উড়োজাহাজের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। বাংলাদেশের মোট এয়ার কার্গোর অর্ধেকেরও বেশি উপসাগরীয় হাব হয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪১ শতাংশ। বিশেষ করে এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত পোশাকের চালান এখন ঢাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আকাশপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও ঝুঁকি বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী অধিকাংশ কনটেইনার জাহাজ সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে চলাচল করে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক জাহাজ বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়সূচির অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শিপিং লাইন নতুন বুকিং নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কেউ কেউ সাময়িকভাবে বুকিং স্থগিত করেছে, আবার কেউ বিকল্প রুটে চলাচলের কারণে ভাড়া বাড়িয়েছে। এতে রফতানিকারকদের জন্য কনটেইনার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়ছে।

বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারক স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ১০ শতাংশ আকাশপথে এবং ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জাহাজে করে উপসাগরীয় রুটে পরিবহন করা হয়। এ রুট তুলনামূলকভাবে কম দূরত্বের হওয়ায় ইউরোপে রফতানির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে বিকল্প হিসেবে ভারতের ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহার করা হতো। ট্রাকে করে পণ্য ভারতের বিমানবন্দরে পাঠিয়ে সেখান থেকে ট্রানজিট করা হতো, যা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সে সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় রুটও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্যাসিফিক রুটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে খরচ ও সময় দুটিই বেশি।

রফতানি খাত এরই মধ্যে ধারাবাহিক চাপের মুখে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের পণ্য রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। একই সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পণ্য রফতানির মোট মূল্য ছিল ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রফতানিতে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সাত মাসে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

এদিকে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে রফতানি ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

রফতানিকারকদের মতে, আগে থেকেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন তারা। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রেড সি পরিস্থিতির কারণে সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজগুলোকে কেপটাউন ঘুরে ভারত মহাসাগর হয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।



banner close
banner close