মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি ও পণ্য আমদানিতে ভারতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও করছে বাংলাদেশ।
দেশে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস দেশ ভারত। তুলা, খাদ্যশস্য, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎসহ নানা পণ্য ও সেবা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। দুই দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশই মূলত ভারত থেকে পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভারত থেকে বাড়তি ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঁচ হাজার টন ডিজেল বাংলাদেশে আসছে।
সরকার জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে এবং বাজার তদারকির পাশাপাশি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ আমদানির মূল্য ছিল ৯০০ কোটি ২ লাখ ডলার। বাংলাদেশে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় তুলা। এছাড়া খাদ্যশস্য, যানবাহন ও যন্ত্রাংশ এবং খনিজ জ্বালানি ও তেলজাত পণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ভারত থেকে কয়েকটি পণ্যের আমদানি বেড়েছে। এর মধ্যে তুলা আমদানি বেড়েছে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং সিরিয়াল বা খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে খনিজ জ্বালানি, তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানিও বেড়েছে ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ।
ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারত যেকোনো পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আগে নিজেদের প্রয়োজন বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রেক্ষাপটে ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুযোগ সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করায় বাংলাদেশ ভারত থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে ভোগ্যপণ্য ও তুলা আমদানির ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতেও ভারতের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুতের মোট চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ সরবরাহ আসে ভারত থেকে। দুই দেশের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় মোট ২ হাজার ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির চুক্তি রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে, যা শিগগিরই ভারতকে দেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জন্য বিভিন্ন ধাপে ডিজেল আমদানির পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা চলছে। গত ৮ মার্চ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে উভয় পক্ষ আগ্রহী।
আরও পড়ুন:








