সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক-এর দুই শাখায় ভুয়া হিসাব ও নকল আমানত রসিদ ব্যবহার করে প্রায় ২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়েছে। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখায় ৭৩টি ভুয়া ঋণ হিসাব খুলে প্রায় ২৫ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রামের পথেরহাট শাখায় এক প্রবাসী গ্রাহকের আমানত রসিদ জাল করে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঋণ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের পথেরহাট শাখায় মোহাম্মদ শাহজাহান নামে এক প্রবাসী গ্রাহক ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ডাবল প্রফিট স্কিমে ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা আমানত রাখেন। অভিযোগ অনুযায়ী, শাখা ব্যবস্থাপক মো. লোকমান হাছান ওই আমানতের বিপরীতে মূল রসিদের আদলে একটি নকল ডিপোজিট স্লিপ তৈরি করেন এবং গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করেন। পরে সেই নকল রসিদ লিয়েন করে একই শাখা থেকে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলন করা হয়।
সম্প্রতি দেশে ফিরে গ্রাহক তার আমানতের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে আমানত সুরক্ষিত আছে মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, গ্রাহক বিদেশে থাকার সময় শাখা ব্যবস্থাপক এককভাবে নকল আমানত রসিদ তৈরি করে গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন, যা প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ওই গ্রাহকের হিসাবে সুদসহ প্রায় এক কোটি টাকা রয়েছে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে পথেরহাট শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. লোকমান হাছান জানান, গ্রাহকের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি এবং বিষয়টি সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট ঋণের অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখায় আরও বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে। ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ওই শাখার কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন একই শাখার সেকেন্ড অফিসারের আইডি ব্যবহার করে কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে ৭৩টি ভুয়া ঋণ হিসাব তৈরি করেন। এসব হিসাবের বিপরীতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার ঋণ সৃষ্টি করে অর্থ বেসরকারি একটি ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনাটি ধরা পড়ার পর বিভিন্নভাবে হিসাব সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে মুন্সীগঞ্জের শ্রীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ক্রয় হিসাব থেকে ঋণ সমন্বয় দেখানো হয়। পরে শাখার জেনারেল লেজার থেকে ওই হিসাব সমন্বয় করা হয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের চাপের মুখে সরিয়ে নেওয়া অর্থের মাধ্যমে ঋণ সমন্বয় করা হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকের ভিজিলেন্স স্কোয়াড বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আবিদ আহমদ আফজালের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত দল ২২ জানুয়ারি জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মো. সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত দলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৭৩টি হিসাবের বাইরে অন্য কোনো হিসাবে অনিয়ম হয়েছে কি না, অন্য কোনো শাখায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং অন্য কোনো কর্মকর্তা এতে সম্পৃক্ত কি না তা যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য।
মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, এটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা ছিল এবং বর্তমানে তা সমাধান হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, অনিয়মে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলেও পথেরহাট শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. লোকমান হাছানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে প্রধান কার্যালয়ের ঋণ আদায় বিভাগে বদলি করা হয়েছে। ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভ্যন্তরীণ কিছু জটিলতার কারণে এখনো দুটি ঘটনায় চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:








