বুধবার

৪ মার্চ, ২০২৬ ২০ ফাল্গুন, ১৪৩২

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো তথ্য: টানা নিম্নমুখী রপ্তানি, মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় বাড়ছে ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০৯

আপডেট: ৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:১৩

শেয়ার

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো তথ্য: টানা নিম্নমুখী রপ্তানি, মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় বাড়ছে ঝুঁকি
ছবি: সংগৃহীত

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা সাত মাস রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক রয়েছে। এর মধ্যেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা রফতানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ২৮১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। যা জানুয়ারির তুলনায় ২২ দশমিক ১০ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এ খাতে আয় কমেছে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে রফতানি আয় হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, যা জানুয়ারির তুলনায় ২০ দশমিক ৮১ শতাংশ কম।

উদ্যোক্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব এখনও কাটেনি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সরবরাহ ঝুঁকি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা শঙ্কা এর পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে পোশাক শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি মূল্য আদায় করা কঠিন হবে। তিনি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং রপ্তানিকারকদের জন্য নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের কারণে ফ্রেইট চার্জ ও বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশের আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এসব চালানের প্রায় সবই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৬ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে, যার অর্ধেকের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় প্রভাব পড়তে পারে।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের রফতানি ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক এবং বাকিটা তাজা ফল-সবজি ও কৃষিপণ্য। আকাশপথে বিঘ্ন ঘটলে পচনশীল পণ্যের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

উপসাগরীয় আকাশসীমায় অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–এ, যা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব। ফ্লাইট স্থগিত ও পুনর্নির্ধারণের কারণে কার্গো চলাচলেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিশেষ ঋণসুবিধা অব্যাহত রাখা এবং রফতানিকারকদের জন্য নীতিগত সহায়তা জোরদার করলে সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলা সহজ হবে। তারা মনে করেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রফতানি আদেশ কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।



banner close
banner close