বান্দরবান কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের আয়কৃত নগদ টাকা থেকে ভ্যাট চালানের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকে তাদের ভ্যাট প্রদান করে প্রতি মাসে। ভ্যাট অফিসের কর্তাদের মতে, বান্দরবানে প্রতিবছর বান্দরবান জেলার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ৭৩কোটি টাকারও বেশি ভ্যাট আদায় করা হয় ভ্যাট চালানের মাধ্যমে। তবে এ ভ্যাট আদায়ে চলছে নানা ছলচাতুরী। ব্যবসায়ীদের প্রতিমাসে মোট আয়ের নামমাত্র অংশ যাচ্ছে সরকারী কোষাগারে। আর দূর্নীতির মাধ্যমে এ ভ্যাটের টাকার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে ভ্যাট কর্তাদের পকেটে।
তাদেরমতে, মাসের আয়ের উপর আনুপাতিক হারে ভ্যাট নির্ধারণ করেন ভ্যাট অফিসে কর্মরত মাঠপর্যায়ে থাকা স্টাফরা। তিনি ভ্যাটের হিসাব করে তা ৩ভাগে ভাগ করেন। একটি অংশ চালানের মাধ্যমে জমা হয় ব্যাংকে। আর ২ভাগে চলে ব্যবসায়ী ও ভ্যাট কর্তাদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিমাসে ঠিকমত জালিয়াতির আশ্রয় না নিয়ে ঠিকমত ভ্যাট নিলে সরকার আরো ২গুন ভ্যাট বেশি পেতো। বর্তমান উপদেষ্টা সরকারের আমলেও বান্দরবান ভ্যাট অফিসের কর্তাদের এমন অনিয়ম দেখে হতবাক ব্যবসায়ীরাও।
এ বিষয়ে বান্দরবানে ভ্যাট দেয়া ফার্নিচারের এক ব্যবসায়ী জানান, একজন স্টাফ এসে আগে পুরো মাসের হিসাব নেন। পরে একটি অংশ চালানের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিতে বলেন। আমরা ওভাবেই ব্যাংকে জমা দেই। আর একটি অংশ তিনি নিজের পকেটে করে নিয়ে যান। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তদন্ত করা দরকার।
বান্দরবান হোটেল মোটেল রিসোর্টের কয়েকজন মালিক গোপনীয়তা রক্ষার শর্তে জানায়, ভ্যাট কর্মকর্তারা প্রতিমাসে ভ্যাট নেয়। তবে যারা ভ্যাট নিতে আসে তারা আমাদের কিছুটা ছাড় দিয়ে
সহযোগিতা করেন এটা সত্য। তবে বিষয়গুলো নিয়ে নিউজ করলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন বিধায় নিউজ না করার অনুরোধ করেন তিনি।
আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, ভ্যাট কর্তাদের দেখলেই বুঝাযায় তারা কি পরিমানে ভ্যাটের অর্থ লোপাট করছে। তাদের বান্দরবানে থাকা অফিসের কর্মচারীরা পর্যন্ত কোটিপতি। তদন্ত করলেই সব বেড়িয়ে যাবে আমাদের এত কিছু বলার দরকার কি?
কয়েকজন মুদি ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমানে প্রায় অফিসে দূর্নীতি কর্মলেও ভ্যাট অফিসে তা বেড়েছে কয়েকগুন। কোন ধরণের তদারকি না থাকায় এমনটা ঘটছে। তিনি বলেন, কোন ধরণের নিয়মনীতির তোয়াক্কা নাই তাই ব্যবসায়ী মাস শেষে যে আয় দেখায় তার উপরই ভ্যাট নির্ধারন করা হয়। আবার ব্যবসায়ীকে একটু সুযোগ সুবিধা না দিলেতো তারা ব্যাংক চালানের বাইরে এক টাকাও লুটে নিতে পারবেনা। তাই তাদের অপকর্ম ঢাকতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তুলনামূলক কম টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে ভ্যাট কর্তারা যেমন খুশি তেমনি ব্যবসায়ীরাও খুশি। মাঝখান থেকে সরকার প্রকৃত ভ্যাট আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব বিষয় তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জাহাঙ্গীর হোসেনসহ জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী।
এদিকে সদরের জাহাঙ্গীর, মুছা, ইলিয়াছসহ কয়েকজন বলেন, বান্দরবানের কোন দোকানে আমরা পন্য কিনতে গেলে অফিসিয়াল কোন ভ্যাট চালান দেয়না। কিন্তু ঠিকই ভ্যাট নিয়ে নেয়। এরকম হলে মাস শেষে ভ্যাট কর্তারা কিভাবে ভ্যাট হিসাব করেন। নিশ্চিত ব্যবসায়ীরা যে হিসাব দেয় তাই ভ্যাট কর্তারা বিশ্বাস করেন। এতে করে সরকারই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর অফিসের কর্মকর্তারা বনে গেছেন কোটিপতি।
এ বিষয়ে কথা বলে অনেকটা সত্যতা মিলেছে বান্দরবান কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা নুরুল আলমের সাথে। তিনি বলেন, বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় মাত্র ২জন ব্যক্তি ভ্যাট উত্তোলনের সাথে জড়িত। তাই সরকার যে পরিমান ভ্যাট পাওয়ার কথা তা পাচ্ছেনা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেকটা বাধ্য হয়েই হিসাব ছাড়া আনুমানিক ভাবে হিসাব করে ভ্যাট নির্ধারন করতে গিয়ে কিছু অনিয়ম হচ্ছে।
এদিকে বান্দরবান কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে তথ্য ফরমে আবেদন করলে অফিসিয়াল গোপনীয়তার অজুহাতে তথ্য না দিয়ে অপারগতা ফরমে অপারগতা প্রকাশ করে কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট বান্দরবান সার্কেল ও বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ সরকার। তিনি জানান, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর ধারা ৭(দ) অনুযায়ী উক্ত তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয় বিধায় সরবরাহকরা আইন পরিপন্থী।
তবে বান্দরবান কাস্টমস্, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে নানা অনিয়ম ও ভ্যাটের টাকা ভাগাভাগি করে একটি বড় অংকের টাকা অফিসের কর্তাদের পকেটে চলে যাবার বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় কর্মকর্তা আবদুস ছামাদ বলেন, ভ্যাট চালানের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা সরাসরি ব্যাংকে ভ্যাট প্রদান করে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করছে তাদের মাধ্যমে একটি নগদ টাকার একটি অংশ সরাসরি অফিসে ভাগ ভাটোয়ারা হয় তা আমার জানা নেই। আমি বিষয়টি খোঁজ নিব।
আরও পড়ুন:








