সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের ইসলামবিদ্বেষী ভাবমূর্তি প্রকট হয়ে উঠছে। মূলত ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনৈতিক দল বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত এক দশকের শাসনামলে এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এই সময়ের মধ্যে কেবল ধর্মীয় কারণে ভারতে ব্যাপক কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী। এটি কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোও এর শিকার। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালদ্বীপসহ অন্যান্যদের সাথেও বর্তমানে তিক্ত সম্পর্ক ভারতের। আঞ্চলিক রাজনীতির বাইরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের এই ইসলাম বিদ্বেষ। তাদের বিরুদ্ধে গাযা যুদ্ধে গণহত্যাকারী ইসরাইলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহেরও অভিযোগ উঠেছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতের ক্ষমতায় বসে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি। এরপর থেকেই অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামবিদ্বেষী একটি অবস্থান নিতে শুরু করে দেশটি। যতোই দিন গড়াচ্ছে এর ভয়াবহতা আরো বাড়ছে। মোদী ক্ষমতায় বসার পর থেকেই এক অশান্ত যাত্রা শুরু হয় ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের। কেবল ধর্মীয় কারণেই বৈষম্য, নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে তাদের। গো-রক্ষার নামে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনেককে পিটিয়ে মারার অভিযোগ আছে হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে। মসজিদসহ মুসলিমদের ধর্মীয় স্থাপনা দখল ও ভাঙচুর, তাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে সেখানে। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে মুসলিম নারীদের নিলামে তুলে উপহাস করারও অভিযোগ আছে হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে।
দিন দিন ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় পরবর্তী ছয় মাসে দেশটিতে মুসলিম বিদ্বেষ ৬২ শতাংশ বেড়ে যায়। মোদী সরকারের ইসলাম বিদ্বেষী অবস্থানের একটি নজির হিসেবে ২০১৯ সালে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ ও ওই অঞ্চলকে কয়েকভাগে ভাগ করে ফেলার বিষয়টিকে সামনে আনেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বর্তমানে কার্যত একটি অবরুদ্ধ অঞ্চল হিসেবে টিকে আছে কাশ্মীর। কাশ্মীরের একটি অংশ আছে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে। সেটি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে চিরবৈরী অবস্থান ভারতের। কাশ্মীরের ওই অংশকেও নিজেদের বলে দাবি করে তারা। শুধু কাশ্মীর নয়, ধর্মীয় বিভেদের দোহাই দিয়ে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। এটিকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সহিংসতা ও দাঙ্গা উস্কে দেয়ার কাজে লাগায় হিন্দুত্ববাদীরা।
কেবল পাকিস্তান নয় মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রতিবেশী বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কৌশল অবলম্বন করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উস্কে দেয়ার চেষ্টা চালায় ভারতের উগ্র ডানপন্থীরা। মোদী সরকারের হিন্দুত্ববাদী ও আধিপত্যবাদী এই একপেশে আচরণের কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বর্তমানে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দিল্লির অবস্থানকে বাংলাদেশের মানুষ তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে মনে করছে।
ভারতের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদী এই আচরণের অভিযোগ মুসলিম সংখ্যাগুরু আরেক প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপেরও। এ কারণেই ভারত হটাওয়ের মতো অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। ভারতবিরোধী প্রচারণা চালিয়েই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুইজ্জু।
কেবল আঞ্চলিক পরিমণ্ডলেই আটকে নেই হিন্দুত্ববাদী ভারতের ইসলাম বিদ্বেষী কার্যকলাপ। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এই বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে তারা। ভারতের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভারত ইসরাইলকে বিভিন্ন সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে। গাজার নুসেইরাতে জাতিসংঘের একটি শরণার্থী শিবিরে হামলার পর সেখান থেকে ভারতের তৈরি করা ক্ষেপণাস্ত্রের নমুনা পাওয়া যায়। এতে লেখা ছিল- মেইড ইন ইন্ডিয়া। চলতি বছরের ১৫ মে ভারতীয় অস্ত্রসরঞ্জাম নিয়ে ইসরাইলে যাচ্ছে, এমন অভিযোগে একটি জাহাজকে নিজেদের বন্দরে ভিড়তে দেয়নি স্পেন। ওই জাহাজে ভারত থেকে বয়ে নেয়া বিস্ফোরক ছিল।
গাজায় বেসামরিক মুসলিমদের হত্যার পক্ষে মানবতাবিরোধী এই অবস্থানের জন্য সারা বিশ্বেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে ভারতকে। ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বড় অংশই এমন অবস্থানের বিপক্ষে থাকলেও হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ও কট্টর অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদীদের মুসলিমবিদ্বেষী এই অবস্থানের ঘোর সমালোচনা করছেন সমাজতাত্ত্বিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বহু ধর্ম, জাতি, মত ও পথের বৈচিত্র্যময় ভারতের জন্য এই ধরনের অবস্থানকে আত্মঘাতী বলছেন তারা। এটি ভারতের স্বার্থেই বড় আকারে আঘাত হানছে বলে সতর্কতা জানানো হচ্ছে।
কূটনীতিকরা বলছেন, এমন অবস্থানের কারণেই প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা কমে গিয়ে ভারত-বিদ্বেষের জন্ম হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশটি ক্রমশ একা হয়ে পড়বে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থানের প্রশ্নে ভারতের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাও মুখ থুবড়ে পড়বে।
আরও পড়ুন:








